বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

আলমগীর মোহাম্মদের অনুবাদগ্রন্থ-আজিব মানুষ (দ্বিতীয় কিস্তি)

ইসমাত চুগতাই ছিলেন উর্দু ভাষার বিখ্যাত ভারতীয় লেখিকা। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস,’আজিব আদমি’ কে বাংলায় 

“আজিব মানুষ” শিরোনামে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক আলমগীর মোহাম্মদ


প্রতি সপ্তাহে কক্সবিডিনিউজের পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে অনুবাদ গ্রন্থটি, আজ থাকছে দ্বিতীয় কিস্তি।


“আজিব মানুষ”
(ইসমাত চুগতাইয়ের ‘আজিব আদমি’র অনুবাদ)
অনুবাদ:আলমগীর মোহাম্মদ


দ্বিতীয় কিস্তিঃ


একদিন গানের রেকর্ড শেষে সুরাইয়া স্টুডিও ছেড়ে চলে যাবার পর ধারাম দেব প্লাটফর্মে এতিমের মতো বিষন্নতা নিয়ে বসে ছিলেন। মঙ্গলার চোখ যদি সেদিন তার দিকে না যেতো তাইলে হয়তো চিরকালই ওখানেই পড়ে থাকতেন তিনি। ধারাম দেব মঙ্গলার চোখের কাজল মিশ্রিত জল মুছে দিতে পারতেন না সাদা শার্টের হাতা দিয়ে!

মঙ্গলার সেদিনের রেকর্ড করা গানটি আজো বাজারে হিট।

সে এই জগতে নাম লিখিয়েছিল গায়িকা হিসেবে। কিন্তু তার শ্যামল বরণ বাঙ্গালী রূপ, লম্বাচওড়া গড়ন, কোঁকড়া চুল এবং ডাগর আখিঁজোড়াই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার জন্য। অভিনয়কে সে ঘৃণা করতো! ধারাম দেবের ছটফটে ভাবটাও বেশিদিনের নয়। মধুবালা ইতোমধ্যে দারুণ কিছু দৃশ্যে অভিনয় করে সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিল, কিন্ত ধারাম দেব মঙ্গলার প্রেমে মত্ত তখনো। সে গায়িকা হিসেবে অতো উঁচু মানের ছিলো না। আসলে গায়িকাদের যেটা দরকার তা হলো সুরেলা কণ্ঠ। এটাই তাদেরকে খ্যাতির উপরের সিঁড়িতে নিয়ে যায়। ভালো কণ্ঠ না থাকলে দৈহিক সৌন্দর্য ও যৌন আবেদনময়ীতার কোন মূল্য নেই এই জগতে। গায়কদের অবশ্যই এই পথগুলোর কোনটাই মাড়াতে হয় না। মেকাপ শিল্পীদের দাবি তখনকার দিনের সৌন্দর্য বর্ধনের বিষয়টা পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন অভিনেতা – অভিনেত্রীরা নিজেরাই মেকাপ নেন। কস্ট্যুম ডিজাইনাররা এখন অনেকটা বেকার। তাদের কাজ বলতে এক্সট্রা অভিনেতাদের কস্ট্যুম তৈরি তাছাড়া আর কিছুই নেই। খ্যাত তারকারা নিজেদের পছন্দসই মাপ দিয়ে কাপড়চোপড় বানিয়ে নেন এবং প্রায়সময় সেগুলো স্টুডিওতে ফেরত দিতে ভুলে যান।

যাহোক, ধারাম দেবের মনে একটা কষ্ট ঘুরপাক খেতে থাকে। মঙ্গলার স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা মুছে ফেলার মতো নয়। জগদ্দল পাথরের মতো এক জায়গায় আটকে থাকা ষষ্ঠ বা সপ্তম অবস্থানের সহকারী পরিচালকদের স্থায়ী কোন কাজকর্ম নেই। ওদের থাকা না থাকার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পরিচালক বেকুবি করলেও কোন মতদ্বৈততা বা পরামর্শ দেয়ার সুযোগ নেই। কিছু বলতে যাওয়া মানেই উদ্ধততা এবং আপনার চাকরিও না থাকতে পারে। নায়করা অযোগ্য, নায়িকারা সবাইকে খুশি করতে ব্যস্ত, আপাতত পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত নেই, সব চাপ পরিচালনা সহকারীদের উপর। সম্ভাবনাময় সকল তরুণ অবহেলিত এবং বুদ্ধিভিত্তিক সম্ভাবনা পদদলিত এখানে। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে, সামান্যতম আক্কেল ও যাদের আছে তাঁদের কপালে ভোগান্তি ছাড়া আর কিছুই নেই।

কিন্তু, স্বপ্নালু, দেদীপ্যমান, কাজলের ছোঁয়া ছাড়া কালো দুটি চোখ বলেঃ
এগিয়ে যাও, ছাইয়ে ঢাকা মানিক জ্বলে উঠবেই, অপরিশোধিত পাথরটা কাটা হবে এবং সবাইকে তাক লাগিয়ে দিবে। শান্তশিষ্ট একটা মেয়ে যে কিনা ঠিকঠাক শাড়িটাই পেঁচিয়ে পরতে পারে না, কথা বলতে গেলে কুঁকড়ে যায় লজ্জায় — কিন্তু কি মধুভরা কণ্ঠ তার!

আর কে আছে সাহায্য করবার? অন্য সবাই ছেনালিপনা জানে। তারা জানে কিভাবে প্রেমের শিখা কিভাবে জ্বালাতে হয় এবং কিভাবে সেই আগুনে অন্যকে পোড়াতে হয়। বাঁকা তীর ধেয়ে আসছে চারদিক থেকে।

ভালো কারো সংস্পর্শে থাকা বাঁচার জন্য খুবই জরুরি। যখন জীবনে দুর্যোগ আসবে, সে আগলে রাখবে, হৃদয় একবার তার গন্তব্যের খোঁজ পেলে, এটা বেরিয়ে পড়বে জীবনের নিয়মে।

সুতরাং ধারাম দেব মঙ্গলাকে আশ্বস্ত করেছেন ‘বালি’ মুক্তি পাবার পর তারা বিয়ে করে মধুচন্দ্রিমায় যাবেন।

‘বালি’ মুক্তি হবার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর সময়ে হয়ে ওঠেনি প্রতিশ্রুত বিয়ে ও মধুচন্দ্রিমার কথা চিন্তা করার। একের পর এক নৈশভোজ, পার্টি ও লোভনীয় অফার আসতে লাগল। গতকাল পর্যন্ত যেই লোক বেকুব তকমায় ভূষিত ছিলেন, তিনি এখন বিবেচিত হচ্ছে বিজ্ঞজন হিসেবে।

‘ ধারাম জ্বি, আপনি নিজেই সিনেমা বানান। অন্যের প্রাপ্তির খাতা ভারি ক’রে কি লাভ?’

তখনকার দিনে স্বাধীন প্রযোজকেরা দ্রুত কাজ করতেন। অতীতে ফিল্ম কোম্পানিগুলো সিনেমা নির্মাণের কাজ করতেন। তাঁদের নিজস্ব স্টুডিও, স্থায়ী কর্মকর্তা -কর্মচারী, নিজস্ব গবেষণাগার, এবং শিল্পী থাকতো। শ্যুটিং হতো রাতের বেলায়, পরেরদিন সকালে দ্রুত প্রিন্ট নিয়ে কাজে যাবার আগেই চোখ বুলিয়ে নেয়া যেত।

একটা কোম্পানি বছরে বড়জোর পাঁচ থেকে ছয়টি সিনেমা নির্মাণ করত। একেকটা সিনেমা বিক্রি হত কোন কিছুই আড়াল না করে। নামধারী পরিবেশকরা এসে এক কপি কিনে নিয়ে হাজার -হাজার কপি বাজারে ছেড়ে দেবার উদ্দ্যেশ্যে নেমে পড়তো।

যুদ্ধের পর আকস্মিকভাবে নতুন গড়ে উঠা সিনেমাহল অনেকাংশে ছাঁটাই হল। সিনেমার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়তে লাগল, ঝাঁকে-ঝাঁকে নতুন পরিবেশকের নেমে পড়ল সিনেমার জগতে, এবং যেহেতু আগের পরিবেশকরা ও বাজারে সক্রিয় ছিল বেশি বেশি সিনেমা নির্মাণ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। এটা ভালো হতো যদি বেশি বেশি সিনেমা বানানো যেত, নতুন নতুন কোম্পানি গড়ে তোলা, তারকা তুলে আনা ও স্টুডিও গড়ে তুলতে পারলে । যেহেতু পরিবেশকরা একসাথে বড়জোর দশ-পনেরো হাজার রুপির বেশি বাজারে বিনিয়োগ করতে অপারগ ছিল, নতুন একটা নিয়ম চালু হয়ে গিয়েছিল সিনেমা জগতে। পরিবেশকরা মনে করতো সিনেমা নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা কোম্পানির নয়, পরিচালক ও তারকাদের; যেহেতু সিনেমার নাম-খ্যাতি নির্ভর করতো তাঁদের উপর। পরবর্তীতে এরা প্রশ্ন করে বসলো, কেন মালিকের কাছে পরিবেশকরা দায়বদ্ধ থাকবে? স্বত্ব বিক্রি করুন পুরো সিনেমার নয়, আংশিক , তা-ও একেকটা অঞ্চলের জন্য। আমরা কিস্তিতে মূল্য শোধ করব, আপনারা কিস্তিতে সিনেমা বানাবেন, তারা বললো।

এটার সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ কি ছিল?
এখন সিনেমা নির্মিত হচ্ছিল কিস্তিতে। সেই যে প্রতিযোগিতা শুরু হল, পরবর্তীতে সবাই ধরে নিল প্রযোজক হওয়া অনেক সহজ। এখান সেখান থেকে যেভাবে পারেন দশ-পনের হাজার রুপি ব্যবস্থা করুন, আর প্রযোজক ব’নে যান।
কোম্পানি বলতে আর কিছুই রইল না, কোম্পানির কর্মকর্তরা সবাই প্রযোজক ব’নে গেলেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কোম্পানি বন্ধ করেভদিলেন, বাকিরা কিস্তিতে প্রযোজকদের কাছে ভাড়া দিলেন তাঁদের স্টুডিওগুলো। শীঘ্রই স্টুডিওর চেয়ে প্রযোজকের সংখ্যা বাড়তে লাগল। স্টুডিওর ঘাটতি মেটাতে আউটডোর শ্যুটিং’র ব্যাপারটা যাচাই করে দেখা হল। কিন্তু, তারকা অভিনেতার অভাবে প্রযোজকেরা দেউলিয়া হয়ে পড়ল। প্রযোজকদের যারা বড়-বড় তারকাদের ভাগিয়ে নিতে পেরেছিলেন তাঁরা সিনেমা নির্মাণে একচ্চত্র অধিপতি ব’নে গেলেন আর বাকিরা তাঁদের পুরোটা সময় ধরে সিনেমা নির্মাণের চেয়ে কিস্তি সামলানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
(চলবে)

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 CoxBDNews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করা চলবে না