শুক্রবার, ২২ মে ২০২০, ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন

দুই কোটি মানুষ পাবে নগদ অর্থ

  • এককালীন আড়াই হাজার করে টাকা পাবে ৫০ লাখ পরিবার
  • প্রধানমন্ত্রী মাইলফলক এ কর্মসূচীর
    আজ উদ্বোধন করবেন


কক্সবিডিনিউজঃ উন্নত দেশগুলোতে রেওয়াজ থাকলেও বাংলাদেশে এই প্রথম দরিদ্র দুই কোটি মানুষের হাতে নগদ টাকা পৌঁছে দিতে যাচ্ছে সরকার। কোন দুর্যোগ মহামারী বা অর্থনৈতিক মহামন্দায় উন্নত দেশগুলোতে আর্থিক সহায়তার আওতায় নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবে নগদ টাকা প্রদানের রেওয়াজ একটি নিয়মিত ব্যাপার। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক মাহামারী করোনার সময়ে আর্থিক সঙ্কট কাটাতে তাদের নাগরিকদের প্রত্যেককে ১২শ’ মার্কিন ডলার করে প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় বয়স্কা, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের নগদ অর্থ প্রদানের রেওয়াজ গত দুই যুগ ধরে চালু হলেও এই প্রথম বাংলাদেশ সরকার একটি বৈশ্বিক দুর্যোগের সময় দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক সঙ্কট কাটাতে তাদের নগদ টাকা প্রদান করতে যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে সারাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে প্রদান করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ১৪ মে বৃহস্পতিবার দেশের এই মাইলফলক কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। গণভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী এই কর্মসূচীর উদ্বোধন করার পর থেকে এই টাকা প্রদান চলবে ঈদের আগ পর্যন্ত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ১০টায় প্রথমে মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবার মাধ্যমে বোতাম টিপে সুবিধাভোগীদের কাছে নগদ অর্থ প্রদানের কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে ২০১৯ সালের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও টিউশন ফি’র টাকা বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।

এই নগদ অর্থ প্রদান কার্যক্রমের আওতায় প্রত্যেক পরিবারের চারজন সদস্য এই অর্থ পাবেন। স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তান। যেহেতু সরকারের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী হচ্ছে- ছেলে হোক, আর মেয়ে হোক প্রত্যেক দম্পতিকে দুটি সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করা। সেই হিসাবে দুটি সন্তান বিবেচনায় প্রত্যেক পরিবারের সদস্য সংখ্যা চারজন ধরা হয়েছে। এই চারজনের প্রত্যেকে ৬শ’ টাকা করে পাবে। ফলে সরকারের এই নগদ অর্থ প্রদান কর্মসূচীতে প্রত্যেক পরিবারকে এক শ’ টাকা খরচসহ আড়াই হাজার টাকা করে দেয়া হবে। এতে সরকারের প্রায় এক হাজার ২৫৭ কোটি টাকা খরচ হবে। গত সোমবার এই টাকা ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী দৈনিক ২ ডলারের নিচে আয় করেন দেশে এমন লোক আছেন ১৫ শতাংশের মতো, সংখ্যায় যা আড়াই কোটির কাছাকাছি। এদের মধ্যে দুই কোটি লোকই সরকারের নগদ অর্থ সহায়তার আওতায় চলে এসেছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ মে ৫০ লাখ পরিবারের খসড়া তালিকা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৫ লাখ সুবিধাভোগী দরিদ্র পরিবারের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর থেকে যাদের মোবাইল ব্যাংক হিসাবে এই টাকা প্রদান শুরু হবে। বাকি ১৫ লাখ পরিবারের তালিকার নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। খুব শীঘ্রই এই তালিকাও চূড়ান্ত হয়ে যাবে এবং পর্যায়ক্রমে ঈদের আগেই তাদের মোবাইল ব্যাংক হিসাবেও নগদ সহায়তার অর্থ চলে যাবে। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি এলাকার তালিকা থেকে ১০ শতাংশ করে নমুনাভিত্তিতে ইতোমধ্যে তা যাচাইয়ের কাজ চলছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে ওই এলাকার ১০০ শতাংশ তালিকা নতুন করে করা হবে।

জানা যায়, এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। আর পরিবার চিহ্নিত করেছে স্থানীয় সরকার অর্থাৎ জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং ইউনিয়ন পরিষদ। গত মাসে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নগদ অর্থ প্রদানের কথা ঘোষণা করেন। প্রথম চিন্তা করা হয়েছিল পরিবার প্রতি এক হাজার টাকা করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে এটি বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করা হয়। কিন্তু প্রস্তাব অনুমোদনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরিদ্র মানুষের দুর্দশার কথা চিন্তা করে আরও ৫শ’ টাকা বাড়িয়ে দেন। ফলে পরিবার প্রতি আড়াই হাজার করে টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে এই অর্থ ছাড় করে দিয়েছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নগদ অর্থ প্রদানের তালিকায় রিক্সাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোল্ট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকের পরিবহন শ্রমিক ও হকারসহ নানা পেশার মানুষকে তালিকার মধ্যে রাখা হয়েছে। তবে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর সহায়তায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী বর্তমানে যেসব সহায়তা পাচ্ছে, এ তালিকায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানা গেছে। অর্থাৎ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর তালিকার বাইরে এই দুই কোটি মানুষকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় ইতোমধ্যে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ নগদ অর্থ সহায়তা পাচ্ছে। প্রতি মাসে তাদের ব্যাংক হিসাবে এই ভাতা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে সামাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহায়তায় ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল জেলায় একটা মডেল দাঁড় করানো হয়েছে। সেই মডেল অনুসরণ করেই করা হয়েছে এই ৫০ লাখ পরিবারের তালিকা। কত পরিবারকে নগদ টাকা দেয়া হবে- এ জন্য জেলাওয়ারি কোটাও বেঁধে দেয়া হয়। তবে সিটি কর্পোরেশনের তালিকা করা হয়েছে বিভাগীয় কমিশনারদের তত্ত্বাবধানে।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে যেসব পরিবার বিপদে পড়েছে, তাদের মধ্য থেকে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে ৫০ লাখ পরিবারের একটি তালিকা করা হয়েছে। সেসব পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দেয়া হবে। ঈদের আগে টাকাটা তাদের কাজে লাগবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই তালিকা করার কাজ করেছে একটি কমিটি। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, সদস্য, সমাজের গণমান্য ব্যক্তি ও প্রশাসনের ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এই কমিঠি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো প্রায় এক মাস ধরে দেখে ঘুরে যাচাই-বাছাই করে এই তালিকা তৈরি করে। একইভাবে পৌরসভা পর্যায়েও তালিকা তৈরির জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি কাজ করেছে।

জানা যায়, দরিদ্র পরিবারগুলোকে টাকা দেয়া হবে মূলত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে বিকাশ, রকেট, নগদ এবং শিউরক্যাশ। অর্থাৎ কাউকে হাতে হাতে টাকা দেয়া হবে না। আর এই টাকা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এমএফএসগুলো বড় আকারের ভর্তুকি দেবে। যেমন লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতি হাজার টাকা পাঠাতে বিকাশের খরচ ১৮ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু এই নগদ সহায়তার টাকা পৌঁছাতে তারা খরচ নেবে প্রতি হাজারে ৬ টাকা। তবে হাজারে ৬ টাকা হিসাবেই পৌঁছানোর এই টাকা পৌঁছাতে সরকারের মোট খরচ হবে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই টাকাও সরকার বহন করবে। পরিবারগুলোর কোন টাকাই দিতে হবে না। তারা পুরো আড়াই হাজার টাকাই পাবে।

মোট ৫০ লাখ পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোর কাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ লাখ পরিবারের কাছে টাকা পাঠাবে নগদ। বিকাশের ভাগে রয়েছে ১৫ লাখের দায়িত্ব। আর বাকি ১৮ লাখ পরিবারের কাছে পৌঁছাবে রকেট ও শিউরক্যাশ। এই টাকা উত্তোলন করতে উপকারভোগীদের কোন টাকা খরচ হবে না। নগদের মাধ্যমে মোট ৪২৫ কোটি টাকা পৌঁছে দেয়া হবে উপকারভোগীদের কাছে। প্রধানমন্ত্রীর বোতামে চাপ প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে নগদের মাধ্যমে মুহূর্তেই এই টাকা পৌঁছে যাবে দরিদ্র উপকারভোগীর মোবাইল হিসাবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে টানা ছুটিতে বন্ধ অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিপাকে দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। করোনা পরিস্থিতিতে বিপাকেপড়া ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে তালিকা। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্তদের দুই হাজার পাঁচ শ’ টাকা করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী।

এদিকে, কর্মহীন মানুষের খাদ্য সহায়তার সারাদেশের জন্য এরই মধ্যে চৌদ্দ দফায় দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রায় এক লাখ ৪৪ হাজার টন চাল ও প্রায় ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। একই সঙ্গে শিশু খাদ্যের সহায়তা হিসাবে সাত দফায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। খাদ্য সহায়তা হিসাবে চলতি মাসে আরও এক লাখ টন চাল বরাদ্দ হচ্ছে। জুন মাসে বরাদ্দ হবে আরও দুই লাখ টন চাল।

অপরদিকে, করোনা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে। বর্তমান বাজার দরে টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তার জন্য সরকার যে কর্মসূচী নিয়েছে তাতে এডিবির অর্থ কাজে লাগানো হবে। গত ৭ মে ফিলিপিন্সের ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত এডিবির বোর্ড সভায় এই অনুমোদন দেয়া হয়।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 CoxBDNews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করা চলবে না