বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:২৯ অপরাহ্ন

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে স্থায়ী হলে কি ঘটবে?

জোশুয়া কুরলানতিক ::

নৃশংস নির্যাতনের ফলে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের প্রত্যাবর্তন শুরুর জন্য এ মাসের গোড়ার দিকে নতুন পরিকল্পনা নেয় মিয়ানমার সরকার। প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য এটা ছিল দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। এর আগে প্রথমবার গত নভেম্বরে চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এবার বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনে প্রায় ৩০০০ রোহিঙ্গার ফিরে যাওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করে মিয়ানমার সরকার। দৃশ্যত এই প্রস্তাব স্বেচ্ছায় কোনো রোহিঙ্গা গ্রহণ করেনি। পরিবর্তে তারা বাংলাদেশে আশ্রয়শিবিরগুলোতে ফিরে গেছেন অথবা পালিয়ে ছিলেন।

রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাইবে না, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ নৃশংসতার মাত্র দু’বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বেশির ভাগ রোহিঙ্গার বসবাস মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে।

ওই রাজ্যটিতে এখনও সহিংসতা রয়েছে এবং তা একটি অস্থিতিশীল স্থানে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে জাতিগত রাখাইন আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াই করছে সেনাবাহিনী। জবাবে প্রচলিত ভয়াবহ কৌশল অবলম্বন করছে সেনারা। এই লড়াইয়ে বেসামরিক লোকজনের বিরুদ্ধে সেনারা হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক অফিস। এ বিষয়ে আরো রিপোর্ট প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা দাবি করেছে, রাখাইনে জাতিগত রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-সহ নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

ওদিকে মিয়ানমার সরকার যখন রোহিঙ্গাদের বলছে যে, তারা নিরাপত্তার সঙ্গে ফিরে যেতে পারেন, ঠিক তখনই দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার জন্য তারা প্রকৃতপক্ষে নিরাপদ, আস্থা অর্জনের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করেনি। রাখাইনে এখনও যে সহিংসতা চলমান তা নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পক্ষে কোনো শক্তিশালী সংকেত দেয় না। রোহিঙ্গাদের অবমাননা এবং তাদেরকে এখনও মিয়ানমারে অবৈধ হিসেবে অব্যাহতভাবে অভিহিত করছেন মিয়ানমার সরকারের সিনিয়র নেতারা। মানবাধিকার বিষয়ক ও অনুসন্ধানী গ্রুপ ফোর্টিফাই রাইটস রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠভাবে নজরদারি করে যাচ্ছে। এ সপ্তাহে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তারা। ফোর্টিফাই রাইটস দেখতে পেয়েছে যে, এখনও দেশের ভিতরে বসবাস করছেন যেসব রোহিঙ্গা তাদেরকে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড গ্রহণ করতে অব্যাহতভাবে শক্তি প্রয়োগ করে বাধ্য করছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এই ভেরিফিকেশন কার্ডে তাদেরকে ‘বিদেশী’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয় এবং তাদের নাগরিকত্বের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়। যেসব রোহিঙ্গার নাম প্রত্যাবর্তনের তালিকায় ছিল অথবা যাদের নিজদেশে তাদের জীবন নতুন করে সাজানোর কথা ছিল তাদের সঙ্গে দৃশ্যত শলাপরামর্শ করেনি মিয়ানমার ও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন দেখতে পেয়েছে যে, যেখানে রোহিঙ্গারা বসবাস করতেন সেই এলাকাগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে সমান করে দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি, অবকাঠামো অথবা সামাজিক সেবার জন্য কোনো প্রস্তুতি ন্যাপিড গ্রহণ করেইনি বলা যায়।

পক্ষান্তরে, রোহিঙ্গাদের দখলে থাকা জমিগুলোতে ডেভলপমেন্ট কাজ করছে মিয়ানমারের কোম্পানিগুলো। আগস্টের শুরুর দিকে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত কোম্পানিগুলো রাখাইন রাজ্যের প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করছে। বর্তমানে ওই রাজ্যে জাতিগত বিন্যাস ঢেলে সাজানোর জন্য এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির প্রমাণ মুছে দেয়ার চেষ্টা চলছে।

এর পরিবর্তে, বাংলাদেশে অবস্থান করা কমপক্ষে ১০ লাখ রোহিঙ্গা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করার চেষ্টা করতে পারে। এমন একটি চিত্রপট ক্রমশ যুক্তিগ্রাহ্য হয়ে উঠছে, যদিও সুইডিশ সাংবাদিক ও লেখক বারটিল লিন্টনারের নোট বলছে, বাংলাদেশ সরকার মরিয়া হয়ে চায় না যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থাকুক। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের এই আশ্রয়শিবির বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে। সেখানে মানুষ উপচে পড়ছে। গাদাগাদি করে অবস্থান করছে তারা। আছে রোগ ছড়িয়ে পড়া ও মানব পাচারের বড় ঝুঁকি। লিন্টনার যেমনটা বলেছেন, শরণার্থীদের নিয়ে ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন বাংলাদেশী নাগরিকরা। তারা উদ্বিগ্ন এ জন্য যে, তারা মনে করছেন রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের কাছ থেকে কর্মসংস্থান কেড়ে নিতে পারে। বিশাল আকারের এই শরণার্থী শিবির পরিবেশের ক্ষতির কারণ। বাস্তবেই এ নিয়ে আশঙ্কা আছে যে, এই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশে যত বেশিদিন এত বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকবেন, ততই বেশি উগ্রপন্থি গ্রুপগুলোর উগ্রবাদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন তারা। মিয়ানমারে ফিরে গেলে রোহিঙ্গারা যে ভয়াবহ দুর্দশায় পড়বেন, সে কথা বিবেচনায় হয়তো তিনি (লিন্টনার) যথার্থই বলেছেন- রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ন্যূনতম দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে যাচ্ছে।

যদি এটাই হয় বাস্তবতা, তাহলে বাংলাদেশ, অন্য দেশগুলো ও দাতা এজেন্সিগুলো এ নিয়ে কি করতে পারে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরে যাবেন এটা ধরে নিয়ে যখন প্রস্তুতি অব্যাহত থাকবে, তখন অন্তত কিছু রোহিঙ্গাকে এই সমস্যা সমাধানের জন্য তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরে জোরালোভাবে চাপ দিতে পারে জাতিসংঘ ও অন্য তৃতীয় পক্ষগুলো। অন্তত এমন কিছু নজির আছে। যেমন, নেপালে অবস্থান করা ভুটানের শরণার্থীদের প্রায় সবাই তৃতীয় একটি দেশে পুনর্বাসন হয়েছেন, যদিও বর্তমান বৈশ্বিক পরিবেশে বিপুল পরিমাণে শরণার্থী গ্রহণ করাটা অবশ্যই একটি কঠিন বিষয় এবং শরণার্থী গ্রহণ করতে নেতারা ক্রমবর্ধমান হারে বিরোধিতা করে আসছেন। এখনও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে কিছু তৃতীয় দেশ আছে। সেখানে অধিক পরিমাণে রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন সম্ভব হতে পারে, কমপক্ষে একটি বড় সংখ্যায়। এমন দেশের মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও কানাডা। তবুও এটাই সম্ভাবনা যে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই থাকতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ও বাইরে থেকে ভূমিকা রাখা দেশ বা সংস্থাগুলোকে সেই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।

(অনলাইন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এ প্রকাশিত ‘হোয়াট হ্যাপেনস ইফ রোহিঙ্গা স্টে ইন বাংলাদেশ ফরএভার?’ শীর্ষক নিবন্ধের অনুবাদ)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 CoxBDNews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করা চলবে না