সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন

কুঁড়েঘর থেকে মন্ত্রী, কে এই সারেঙ্গি?

কক্সবিডি নিউজ::

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে গত বৃহস্পতিবার নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। এই মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছেন ভারতের উড়িষ্যার বালেশ্বর থেকে নির্বাচিত বিজেপি নেতা প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গি। নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সারেঙ্গিকে।

মন্ত্রিসভায় যখন তার নাম ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন সবচেয়ে বেশি করতালি পড়েছিল অপরিচিত এই ব্যক্তির জন্য। কারণ তার কুঁড়েঘরে থাকা, সাইকেলে করে চলাফেরা করা, এমনকি নির্বাচনী প্রচারে অটোতে চড়ে সাধারণ মানুষের দুয়ারে গিয়ে ভোট চাওয়াটাও নজর কেড়েছে বেশিরভাগ মানুষের।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি আপলোড হওয়ার পর রাতারাতি তা ভাইরাল হয়ে যায়। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাওয়ার জন্য একেবারে সাধারণ পোশাকে তিনি যেন সেই বেড়ার কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। কপর্দকহীন অবস্থা থেকে বিপুল বিত্তশালী হওয়ার কাহিনী ভারতে সবসময় সাড়া জাগায়। রাজনীতিতে সারেঙ্গির কাহিনীও সেরকম তোলপাড় সৃষ্টি করে।
কিন্তু জনপ্রিয়তা পাওয়া এই প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গি আসলে কে? যাকে নিয়ে সারাধণ মানুষের এত আগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসানো, ব্যক্তিজীবনে সাদাসিদেভাবে চলাফেরা করা এই ব্যক্তি কর্মজীবনই কী আসলে এরকমই?

সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতাপ চন্দ্র সারেঙ্গির অতীত ইতিহাস যেভাবে আসলে উল্লেখ করা হয়েছে বা দেখানো হচ্ছে, ঠিক ততোটা মসৃণ ছিল না। রাজনীতিতে এমন কী রাজ্যের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনায় তার অবস্থান ছিল সমালোচিত।

১৯৯৯ সালে ভারতে একজন খ্রিষ্টান মিশনারি গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই সন্তান খুন হন হিন্দু জনতার হাতে। ভারতের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেন কট্টরপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী বজরং দলকে। প্রতাপ চন্দ্র সারাঙ্গি তখন ছিলেন বজরং দলের নেতা। তবে সরকারি তদন্তে ওই ঘটনার সঙ্গে কোনো গোষ্ঠীর সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

২০০৩ সালে দীর্ঘ বিচার শেষে এই ঘটনায় মোট ১৩ জনকে সাজা দেয় আদালত। তাদের একজন দারা সিং ছিলেন বজরং দলের সদস্য। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। উড়িষ্যার হাইকোর্ট দুবছর পর অবশ্য তার মৃত্যুদণ্ড রদ করে দেয়। সেই সঙ্গে আরও ১১ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে মুক্তি দেয় আদালত। কারণ তাদের সাজা দেয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারেঙ্গি তখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, খ্রিস্টান মিশনারীরা পুরো ভারতকে ধর্মান্তরিত করার শয়তানি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। সেই সময়ে সারেঙ্গির যারা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তাদের একজন ছিলেন উড়িষ্যার সাংবাদিক সন্দীপ সাহু।

সেই সাক্ষাৎকারে সারেঙ্গি যদিও খ্রিস্টান মিশনারী গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই সন্তানকে হত্যার নিন্দা করেছিলেন। কিন্তু ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে তিনি তার শক্ত দৃষ্টিভঙ্গীতে অনড় ছিলেন বলে জানা গেছে।

এরপর ২০০২ সালে বজরং দলসহ ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো উড়িষ্যা রাজ্য বিধান সভায় হামলা চালায়। এই ঘটনায় সারাঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অগ্নিসংযোগ, হামলা এবং সরকারি সম্পদের ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়।

সারেঙ্গি মন্ত্রী হওয়ার পর তার ব্যক্তিগত জীবনযানের নানা দিক ফুঁটে উঠলেও এসব বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছুই লেখালেখি হয়নি। সারেঙ্গি তার এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার জন্য সাইকেলে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। ভুবনেশ্বরেও প্রায়শই তাকে দেখা যায় পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে রাজ্য পরিষদের সভায় যাচ্ছেন। রাস্তার ধারের কোনো সাধারণ খাবার দোকানে খাচ্ছেন। রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন।

সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনে প্রতাপ সারেঙ্গি তার দুই বিত্তশালী ও ক্ষমতাবান প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করেছেন। বৃহস্পতিবার যখন তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তার নির্বাচনী এলাকায় উৎসব শুরু হয়ে যায়। সমর্থকরা আতশবাজি পুড়িয়ে এবং মিষ্টি বিতরণ করে তাদের উল্লাস প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাকে এরই মধ্যে ‘উড়িষ্যার মোদি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 CoxBDNews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: কপি করা চলবে না