বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ০১:১২ অপরাহ্ন

বর্বরতা

সিএন ডেস্ক।।

আলিম পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে গিয়েছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। কিন্তু পরীক্ষা আর দেয়া হলো না। এর আগেই দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে পুড়ে হাসপাতালে যেতে হয় তাকে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় আনা হয় ঢাকায়। শরীরের ৭৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া রাফির অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। নির্মম এ ঘটনা ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রের। ওই মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করার কারণে অধ্যক্ষের লোকজনই তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন রাফির পরিবারের সদস্যরা। এর আগেও একবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিলেন রাফি।

গতকাল সকালে বড় ভাইয়ের সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রে যান রাফি। বোনকে কেন্দ্রে রেখে ভাই বাড়ি ফেরার আগেই রাফি অগ্নিদগ্ধ হওয়ার খবর পান। রাফি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে পরিবারের সদস্যরা জানান, রাফি পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের পরই বোরকা পরা এক শিক্ষার্থী রাফিকে বলে তার এক সহপাঠীকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে।

এ খবর শুনে রাফি দৌড়ে ছাদে যান। তখন সেখানে থাকা বোরকা পরা আরো চার জনের একজন রাফিকে বলে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ যাতে তুলে নেয়। রাফি এতে রাজি না হওয়ায় অন্যরা তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। দুর্বৃত্তদের একজন নারী কণ্ঠে কথা বলেছে। বাকি তিন জন নারী না পুরুষ তা বুঝতে পারেনি রাফি। রাফির চিৎকারে সহপাঠীরা ছুটে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। দগ্ধ রাফি সোনাগাজী পৌরসভার চরচান্দিয়া গ্রামের একেএম মুসার মেয়ে। এ ঘটনায় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক শিক্ষকসহ দুই জনকে আটক করেছে। রাফির ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, গত ২৭শে মার্চ উপজেলার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা তার নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানি করে। পরে নুসরাত বিষয়টি পরিবারকে জানায়। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে থানায় মামলা করলে পরদিন ২৮শে মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর থেকে নুসরাত জাহানের পরিবারকে মামলা তুলে নিতে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল অধ্যক্ষের লোকজন।

দগ্ধ রাফিকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে জেলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় আনা হয়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢামেক বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন মানবজমিনকে বলেন, নুসরাতের শারীরিক অবস্থা ভালো না। ৭০ ভাগের বেশি পুড়ে গেছে। সবই মেজর বার্ন। সে খুব আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। একই বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, দগ্ধ শিক্ষার্থীর শরীরে ৭৫ ভাগ বার্ন রয়েছে। তার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক।

নুসরাতের বাবা একেএম মুসা জানান, কোম্পানীগঞ্জে একটি মাদরাসায় ইমাম হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে নুসরাত তৃতীয়। সন্তানদের সবাই মাদরাসায় পড়ালেখা করে।
সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামাল হোসেন জানান, পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক শিক্ষক ও এক শিক্ষার্থীকে আটক করেছে। এর আগে শ্লীলতাহানির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানির ঘটনায় গত কয়েকদিন নির্যাতিত শিক্ষার্থী ও অধ্যক্ষের পক্ষে বিপক্ষে একাধিক মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা। রাফির স্বজনদের অভিযোগ ওই মাদরাসা অধ্যক্ষ অনেক অপকর্ম করে আসলেও মাদরাসা সংশ্লিষ্ট কেউ এর প্রতিবাদ করেন না। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হয় না।

এর আগে ২০১৬ সালে দাখিল পরীক্ষা দেয়ার সময়ও এলাকার দুর্বৃত্তরা রাফির ওপর হামলা চালায়। সেবার তার চোখে চুন মারা হয়। এতে রাফির ডান চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 CoxBDNews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com