শনিবার, ২৫ মে ২০১৯, ০৮:১৭ পূর্বাহ্ন

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়

সিএন ডেস্ক।।

প্রশাসনিক কাজে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চায় না সরকার। মন্ত্রী, এমপি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা সরকারি কজে হস্তক্ষেপ করলে তাতে সমর্থন না দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি, ইউএনওকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এরপর কোনো মন্ত্রী-এমপি কিংবা রাজনৈতিক নেতা সরকারি কাজে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেন তবে তাৎক্ষণিক টেলিফোনে বা লিখিত আকারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয়। এতে বলা হয়েছে- সরকারি কাজের টেন্ডার, নিয়োগ বাণিজ্য, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে মন্ত্রী-এমপি ও স্থানীয় নেতারা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য,থানায় মামলার তদবির ও স্থানীয় প্রশাসনে রদবদল,মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার অর্থ বিলি-বণ্টনে প্রভাবও বিস্তার করতে পারবেন না। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন কুড়িগ্রামের ডিসি মোছা. সুলতানা পারভীন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বেশ কিছু নির্দেশনা সংবলিত একটি চিঠি পেয়েছি। এ চিঠি আমাদের কাজের গতি ও সর্বক্ষেত্রে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করা আরও সহজ করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে এ নির্দেশনা পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’ কুড়িগ্রামের ফেসবুক পেজে জনসচেতনতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো পোস্ট করা হয়েছে বলেও জানান মাঠ প্রশাসনের এ কর্মকর্তা।

সূত্র জানায়, চিঠিতে বলা হয়- স্থানীয় পর্যায়ে টেন্ডার বা সরকারি কোনো কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না এমপিরা। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারি পদে নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়- নিয়োগের ব্যাপারে এমপিদের পক্ষ থেকে কোনো ডিও লেটার দেয়া যাবে না। যদি কেউ দেন তাহলে সেই প্রার্থীকেই অযোগ্য বিবেচনা করা হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রায়ই অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন স্থানীয় এমপিরা। একনেকের সভায় এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গুটিকয়েক নেতার সুবিধার জন্য কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার মাস্টারপ্ল্যানে পরিবর্তন করা হবে না। এমপিরা নিজ এলাকায় থানার ওপর খবরদারি করেন এবং বিভিন্ন মামলার আসামি ও জামিনে হস্তক্ষেপ করেন। এতে হয়রানির শিকার হন অনেকেই। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ বিভিন্ন রকম সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ ও সহায়তা অনেক সময় এমপিদের হস্তক্ষেপের কারণে সঠিক লোকের কাছে যায় না। প্রকৃত দরিদ্র, বিধবা বা বয়স্ককে না দিয়ে টাকা এমপিদের পছন্দের লোকদের দেয়া হয়। এমপিরা তাদের পছন্দমতো স্থানীয় প্রশাসন ঢেলে সাজান এবং এজন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা পুলিশ সদর দফতরে তদবিরও করেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসপি বা ওসি পদে এমপিরা সবসময় তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের বসাতে চান। স্থানীয় প্রশাসনে নিয়োগ হবে কেন্দ্রীয়ভাবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। অনেকে এমপি হওয়ার পর তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে নানা রকম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ও সেগুলোর প্রসার ঘটান। ব্যবসা-বাণিজ্য করতে অসুবিধা নেই। কিন্তু এমন কিছু করা যাবে না যাতে করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। যে কাজের জন্য যোগ্য নয়, সে কাজ যেন কোনো এমপি না পান তার ব্যাপারে সর্তক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কোনো এমপি যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক বা পৃষ্ঠপোষকতা না করেন সে বিষয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের এমন নির্দেশনা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন আরও একাধিক বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসি। সিলেটের ডিসি এম. কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রশাসনিক কাজে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চায় না সরকার। মাঠপ্রশাসনের যে কোনো কাজে সব ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও চাপ উপেক্ষা করে নির্ভয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সরকার প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়া হচ্ছে না। ফলে সরকারি বিভিন্ন দফতরের নিয়োগ, টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ কমে গেছে।’

মাগুরার ডিসি এম আলী আকবর বলেন, ‘সব ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ উপেক্ষা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। প্রভাবশালীদের সব ভয়ভীতি ও রক্তচক্ষু পাশ কাটিয়ে আমরা আইন অনুযায়ী কাজ করছি। সরকারের এ নির্দেশনা আমাদের কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে।’

জানা গেছে, নির্বিঘ্নে প্রশাসনিক কাজ করতে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এসব নির্দেশনা ইতিমধ্যে জেলা বাতায়ন বা জেলা প্রশাসনের নিজস্ব ফেসবুক পেজে দেয়া হয়েছে। জনসচেতনতার জন্য বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতেও এসব নির্দেশনার অবহিত করছে জেলা প্রশাসন। ইতিমধ্যে সরকারের সব সেক্টরে অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বর্তমান সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে নতুনদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় মন্ত্রীরা কঠোর নজরদারির মধ্যে আছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে শুধু মন্ত্রীরা নন, কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবেন সংসদ সদস্যরাও। এরপর মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দেয়া কঠোর বার্তা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রশাসন বিষয়ক কলামিস্ট আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত হলে তা খুবই ভালো। প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অনুচিত। এ ধরনের হস্তক্ষেপ হলে প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুনভাবে এসব বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হলে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। তবেই জনগণ এর সুফল পাবেন।’ তিনি বলেন, প্রশাসনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যাতে না হয় সে ধরনের অনেক কিছুই কাগজে-কলমে আছে। কিন্তু যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয় না।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, ‘এ ধরনের নির্দেশনা দেয়া হলে তা অবশ্যই ভালো। তবে এর বাস্তবায়ন হল কিনা সেটাই বড় কথা। বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা যদি মনিটরিং না করা হয় তবে এর সফলতা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। তাছাড়া যাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যেও অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। সুতরাং এর বাস্তবায়ন কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।’


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 CoxBDNews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com