মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ১১:০১ পূর্বাহ্ন

আওয়ামী লীগকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে

ad

সিএন।।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনায় আওয়ামী লীগকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে শনিবার ওই গৃহবধূকে দেখতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, সুবর্ণচরের ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত এবং এর পেছনে যারা রয়েছে তাদের প্রত্যেকের বিচার করতে হবে।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। গৃহবধূকে সান্ত্বনা জানাতে গিয়ে কেঁদেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, বোন, আমরা তোমার পাশে আছি। তোমার কোনো ভয় নেই। এ নির্মমতার অবশ্যই একদিন বিচার হবে। আল্লাহ বিচার করবেন। এ সময় মির্জা ফখরুলকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন গৃহবধূর স্বামীও।

জেএসডির আ স ম আবদুর রব ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও ওই গৃহবধূর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন। গৃহবধূর স্বামী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে মির্জা ফখরুল কথা বলেন। তাদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। পরে গৃহবধূকে অর্থ সহায়তা দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল, আবদুর রব ও কাদের সিদ্দিকী।

হাসপাতালে সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, ভোটের অধিকার থেকে আওয়ামী লীগ মানুষকে বঞ্চিত করেছে, জনগণকে প্রতারিত করেছে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এবং মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় আওয়ামী লীগ এখন গণশত্র“তে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনের পর সহিংসতায় অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে। নোয়াখালীতে গৃহবধূর ধর্ষণের ঘটনায় আমরা ধিক্কার জানাচ্ছি, তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। জনগণের কাছে এর বিচার দিচ্ছি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ অবস্থান নেয়ায় দেশের রাজনীতিতে একটা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হবে। আমরা মনে করি, দেশ একটা অন্ধকার যুগে প্রবেশ করল; বাংলাদেশ গণতন্ত্রবিহীন হল। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে আওয়ামী লীগের নীলনকশার দিকে দেশ এগিয়ে গেল। বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট এখন কী করবে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা বরকতউল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবদিন ফারুক, আতাউর রহমান ঢালী, শামসুল আলম, মাহবুব উদ্দিন খোকন, হারুনুর রশীদ, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, কামরুজ্জামান রতন, শিরীন সুলতানা, রেহানা আখতার রানু, সৈয়দ আসিফা আশরাফী পাপিয়া, শামীমা বরকত লাকী, হারুনুর রশীদ, আকবর হোসেন, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের হাবিবুর রহমান খোকা, জেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি, সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান, শহর বিএনপির সভাপতি আবু নাসের, স্থানীয় নেতা মঞ্জুরুল আজিম সুমন, নুরুল আমিন খান, সাবের আহমেদ, মিজানুর রহমান মিজান, আবু হাসান নোমান প্রমুখ।

এদিকে, একই দিন বিকালে জেলা আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে জেলা জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি মহসচিবসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা যোগ দেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, হতাশ হবেন না। ক্ষোভকে শক্তিতে পরিণত করে ক্ষমতাসীনদের পরাজিত করতে হবে।

তিনি বলেন, আজকে এখানে তরুণদের মাঝে যে ক্ষোভ দেখলাম, এ ক্ষোভকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। সরকার চোরাবালির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তারা ইতিমধ্যে জনগণের শত্র“ হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের পরাজিত করতে যা প্রয়োজন তা শুধু ঐক্য, ঐক্য, ঐক্য। জনগণের ঐক্যের মধ্য দিয়ে আমরা তাদের পরাজিত করতে পারব ইনশাআল্লাহ।

মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একটি সরকার তার সব প্রশাসনকে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ওপর ঠিক একই কায়দায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমাদের যে অধিকার সেই অধিকার তারা কেড়ে নিল। আমরা কোনো বাধা দিতে পারিনি। কেন ভোটের দিন জনগণ জেগে ওঠেনি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় ছুটে গিয়ে বারবার বলেছি ‘জেগে উঠুন, আপনাদের অধিকার রক্ষা করুন।’ কিন্তু আমরা রক্ষা করতে পারিনি। কারণ আমরা সুশৃঙ্খল নই।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের কেন ক্ষোভ হয় না? রাগ হয় না? উত্তেজনা হয় না? আমরা কেন রুখে দাঁড়াতে পারি না? আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আন্দোলন সৃষ্টি করে আমরা একটা সুযোগ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হয়নি। তাই বলে কি সব শেষ হয়ে গেছে! হয়নি। কিছুই শেষ হয়নি। আমরা আবার রুখে দাঁড়াব। তিনি বলেন, আপনাদের কাছে অনুরোধ, রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। ঐক্যফ্রন্টকে শক্তিশালী করতে হলে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে একটি জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। তবেই আমাদের জয় হবে।

জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ভোট তো হয়নি। ভোটের তারিখ ছিল ৩০ ডিসেম্বরে। কিন্তু ২৯ ডিসেম্বর ব্যালট শেষ। ১৯৫৪ সাল থেকে আমি ভোট দেয়া দেখছি। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সব ভোট দেখেছি। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও এমন ভোট হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। এটি কলঙ্কিত উলঙ্গ ভোট ডাকাতি শুধু নয়, মহাডাকাতি। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশ সুবর্ণচর হয়ে যাবে। মা-বোন-মেয়ে নিয়ে মানইজ্জতের সঙ্গে বেঁচে থাকবেন কিভাবে? এটা হয় না। একাত্তরে যেভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছে, এ হায়েনার বিরুদ্ধেও সেভাবে রুখে না দাঁড়ালে মানইজ্জত নিয়ে কেউ বাঁচতে পারবে না। এ হায়েনাদের রুখতে হবে, এ জালেমদের রুখতে হবে, এ জানোয়ারদের রুখতে হবে। সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অবৈধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি (শেখ হাসিনা) তড়িঘড়ি করে শপথ নিয়েছেন। আপনি তো ভোটে জেতেন নাই। আপনার শপথ নেয়া বেআইনি। দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আছে। ওই সংসদ বাতিল না করে কীভাবে শপথ হল। এ শপথ সংবিধান বিরোধী ও নীতিনৈতিকতা বিরোধী। তিনি বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন করবে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়নি, প্রহসন হয়েছে। আজকে আইন নেই, বিচার নেই, প্রশাসন নেই, পুলিশ নেই। সব দলীয় হয়ে গেছে। তাদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে হলে প্রথম নিজেকে তৈরি করতে হবে। সবাইকে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে। শেখ হাসিনাকে জননেত্রী সম্বোধন করতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি শেখ হাসিনাকে সব সময় জননেত্রী বলতাম। আপনাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার সামনেও আমি বলেছি। খালেদা জিয়া আমাকে বলেন, ভাই এরপরও আপনি জননেত্রী বলেন। আমি বলেছিলাম, বলতে বলতে অভ্যাস হয়ে গেছে। ২ জানুয়ারি জননেত্রীর আসন থেকে ও আমার অন্তর থেকে তাকে ত্যাগ করেছি।

এদিকে, আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার পর বেগমগঞ্জের শরীফপুর ইউনিয়নের মুরাদপুর গ্রামে সন্ত্রাসীদের পুড়িয়ে দেয়া বাড়িঘর দেখেন বিএনপি নেতারা। ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তারা কথা বলেন। এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু ও তার স্ত্রী শামীম আরা লাকীসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেনবাগে জয়নুল আবদিনের বাড়িতেও যান বিএনপি নেতারা। এরপর ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন বিএনপি মহাসচিবসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।

শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় রাজধানী গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে বিএনপি মহাসচিবসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হন। কুমিল্লায় জমজম রেস্টুরেন্টে যাত্রা বিরতিকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ভোটের আগে, ভোটের দিন ও ভোটের পরে সহিংসতার মধ্য দিয়ে গোটা দেশে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নেতারা নোয়াখালীতে পৌঁছান। পৌরভবন থেকে হাসপাতাল সড়ক পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিএনপি মহাসচিবসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের স্বাগত জানান। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে এবং ‘ভুয়া নির্বাচন’ বলেও তারা স্লোগান দেন।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 CoxBDNews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com